এই ফাইলটি নিয়ে আপনার কি সমস্যা ??

গল্প যখন সত্য হয় » শুভঙ্কর চক্রবর্তী » » পর্ব » 1

গল্প যখন সত্য হয় » শুভঙ্কর চক্রবর্তী »

কুসুমপুর গ্রাম, বর্ধমান কাটোয়া লাইনের পাশে একটা ছােট্ট বর্ধিষ্ণু অঞ্চল। শান্ত, স্নিগ্ধ, ছুরির মতাে গ্রামের বুক চিরে বেরিয়ে যাওয়া রেললাইন। পাশেই অজয় নদ। শ্যামল-কমল দুই হরিহর আত্মা। বছর বারাের এই দুই বন্ধু সকল কাজই একসঙ্গে করে। স্কুল থেকে ফিরছিলাে দু’জনে রেলব্রীজ ক্রস করার সময় দেখতে পেল, ফিসপ্লেট খুলে রেল লাইন নীচের দিকে ঝুলে রয়েছে।

বুঝতে পারলাে সামনে ভয়ঙ্কর বিপদ, আর দেরী করলে, বহু মানুষের জীবন চলে যাবে। একমুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিল দু’জনা। বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে, গায়ের লাল সােয়েটার খুলে নিল শ্যামল। একটা লাঠি জোগাড় করে তাতে সােয়েটার বেঁধে লাইনে পুতে দিল। সময় বয়ে যেতে লাগল, সাহসী ছেলেদুটোর চোখে পড়ল সিগনাল সবুজ হয়েছে। ট্রেন দেখা যাচ্ছে, প্রাণপনে তারা হাত নাড়তে লাগল।

অনেক দূর থেকে ট্রেনের চালক লক্ষ্য করলেন, লাইনে লাল কিছু পােতা রয়েছে, আর দুটো ছেলে প্রাণপনে হাত নাড়ছে। প্রমাদ গুনলেন তিনি, বিপদের আশঙ্কায় ট্রেনের গতি কমিয়ে দিলেন। নির্দিষ্ট সীমানার আগেই ট্রেন থামলাে। ইঞ্জিন থেকে নেমে সামনের দিকে এগিয়ে চললেন চালক। দুই বন্ধুর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলেন – “তােমরা ট্রেন থামালে কেন?’সদ্য কৈশােরে পা দেওয়া যুবকের নির্ভয় জবাব –‘সামনে নদীর ওপর লাইনের ফিসপ্লেট খুলে, লাইনে ঝুলে পড়েছে, তাই বিপদের আশঙ্কায় আমরা ট্রেন থামিয়েছি।‘চলাে তাে দেখি কী ঘটেছে?—বললেন ড্রাইভার।

‘চলুন ওই তাে পুলের ওপর’ বলে ড্রাইভারকে এগিয়ে নিয়ে যেতে লাগল তারা। ইতিমধ্যে গার্ডও এসে উপস্থিত হয়েছে। পুলের ওপর উঠে গা টা শিউরে উঠল চালকের। এর ওপর দিয়ে ট্রেনগেলে। আজ কয়েকশাে মানুষের জীবনহানি হতে পারত। নবজীবনের আনন্দে দুই অসীম সাহসী যুবককে বুকে জড়িয়ে ধরলেন চালক। ধরা গলায় বললেন- “তােমরা কি করেছ, তােমরা জানাে না, আজ যে সাহসিকতার পরিচয় তােমরা দিয়েছ তাতে আমি মুগ্ধ।

তােমাদের নাম আমি রেলের সাহসিকতা। পুরস্কারের জন্য মনােনীত করতে সুপারিশ করব। চালক জিজ্ঞেস করলেন- তােমাদের নাম বলাে? আমার নাম শ্যামল সরকার’ আর ও ‘কমল মজুমদার’ বলল শ্যমল। ইতিমধ্যে আধঘন্টা অতিক্রান্ত। রেলের বড় আধিকারিক রেল। পুলিশের কর্তা সবাই এসে উপস্থিত হয়েছে। সবে কৈশােরে পা দিলেও শ্যামল বাইরের জগত সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল।

সে জানে অনেকসময় নাশকতার জন্য মাওবাদীরা বা জঙ্গীরা এইরকম লাইন খুলে রাখে। কিরকম একটা দমবদ্ধ ব্যাপার, বুকের মধ্যে এমন চাপা ভয়, আতঙ্ক অনুভব করল শ্যামল। পুলিশকর্তাটি শ্যামলের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। সে অনুভব করল ইতিমধ্যে তার জামা গায়ে ভিজে গেছে। মনে মনে ভাবতে লাগল, বিনা দোষে তার জেল হবে না তাে, সে যে এটা ঘটায়নি, সে যে মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে, এটা পুলিশকর্তা বিশ্বাস করবে তাে, এরকম বিভিন্ন চিন্তা তার মাথায় ঘুরতে থাকল। হঠাৎ কাঁধে একটা ভারি হাতের স্পর্শে সে চমকে উঠল।

শ্যামলের মনে হল এই বুঝি পুলিশকর্তা তাকে হিড় হিড় করে সকলের সামনে দিয়ে টানতে টানতে নিয়ে যাবে। ঈশ্বর করুণাময়, শ্যামলের মনে পড়ে গেল তার গুরুদেবের বাণী। দুর্বলতায় মৃত্যু, দুর্বলতায় মৃত্যু’, সাহস অর্জন করে পুলিশকর্তার মুখােমুখি হল শ্যামল। পুলিশকর্তা শ্যামলের সাথে কথা বলে বুঝতে চাইল, এটা অকস্মাৎ দুর্ঘটনা, না ঘটানাে হয়েছে।

সে জিজ্ঞেস করল— তুমি রেল লাইনের খােলা ফিসপ্লেট প্রথম দেখেছে?
» হ্যা,
» তােমার নাম কী?
» বলল।
» শ্যামল সরকার
» তুমি এখানে কি করছিলে?
» আমি এখান দিয়েই আমার বন্ধু কমলের সাথে প্রতিদিন স্কুল থেকে ফিরি শ্যামল।

ইতিমধ্যে শ্যামলের বাবা, গ্রামের প্রধান, গ্রামবাসী সকলেই সেখানে এসে উপস্থিত। সকলের মুখেই শ্যামল-কমল এর জয়ধ্বনি। প্রধান এসে তাদের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললাে ‘সাবাস বেটা সাবাস’, তােরা আমাদের গ্রামের গর্ব, আমাদের গৌরব’। মা মাথায় হাত রেখে বললাে –“ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি, তুই এভাবেই যেন মানুষের উপকার করতে পারিস। ইতিমধ্যে ইঞ্জিনিয়াররা লাইন সারানাের কাজ শুরু করেছে। সাংবাদিকরাও উপস্থিত হয়েছে।

পদস্থ রেলকর্তা, সাংবাদিক ও গ্রামবাসীদের সামনেই ঘােষণা করল, – শ্যামলকমল আমাদের গর্ব, দেশের গর্ব, তােমাদের। আমি রেলের সাহসিকতা পুরস্কারের জন্য মনােনীত করব, তােমাদের পড়াশুনার সব খরচ রেল যাতে বহন করে তার চেষ্টা করব।” করতালিতে ফেটে পড়ল পুরাে এলাকা। আনন্দের বহর সামলে, সাংবাদিক এসে শ্যামলকে জিজ্ঞেস করল –‘তােমার এই সাহসের প্রেরণা কে?’ শ্যামল নিরুত্তর রইলাে, শুধু গলা থেকে বের করে আনলাে গুরুদেবের লকেট, যেখানে বিরাজমান স্বামী বিবেকানন্দ।

সবাই অবাক চোখে দেখল, শ্যামলের চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে, কমলের চোখ অশ্রুভেজা। শ্যামল বলল, “ছােটোবেলায় মা আমায় বিবেকবাণী, আর এই লকেটটা এনে দিয়েছিলাে, আর বলেছিলাে,সব সময় মানুষের জন্য কাজ করবে। আমি বিবেকবাণীতে পড়েছি, স্বামীজি বলেছেন – ‘দুর্বলতা ত্যাগ করাে, দুর্বলতাই পাপ, দুর্বলতাই মৃত্যু, সাহসী হও, বীর্যবান হও, নিজের ভাগ্যের তুমি নিজেই রচয়িতা।

স্বামীজিই আমার প্রেরণা’ – বলল শ্যামল। কমল বলল ‘আমারও’ | ইতিমধ্যে লাইন মেরামত হয়েছে, আরও একবার ধন্যবাদ জানিয়ে চালক চলে গেলেন। দুই বন্ধু গ্রামবাসীদের কাধে চেপে বাড়ি ফিরলাে।

আপত্তি জানান
  • আর কোনো পর্ব নেই এই অধ্যায়ে।

কমেন্ট -

error: Alert: Content is protected !!